মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো দুরুদ শরীফ পাঠ করা। দুরুদ পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দা আল্লাহর রহমত লাভ করেন এবং নবীজির শাফায়াত লাভের উপযুক্ত হন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং নবীজির ওপর দুরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
গুগল সার্চে অনেকেই দুরুদ শরীফ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, যেমন— "দুরুদ শরীফ কী?", "দুরুদ কত প্রকার?", "সবচেয়ে ছোট দুরুদ শরীফ" কোনটি, অথবা "দুরুদ শরীফ নামাজের" সঠিক উচ্চারণ কী। আপনাদের এই সকল জিজ্ঞাসার উত্তর এবং দুরুদ শরীফের বিস্তারিত ফজিলত নিয়েই আমাদের আজকের এই পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।
১. দুরুদ শরীফ কী এবং দুরুদ আরবিতে কী?
দুরুদ শরীফ কী?
'দুরুদ' মূলত একটি ফার্সি শব্দ, যা আমাদের উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হলো রহমত, দোয়া, প্রশংসা বা আশীর্বাদ। ইসলামি পরিভাষায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষণের জন্য যে বিশেষ দোয়া বা বাক্য পাঠ করা হয়, তাকেই দুরুদ শরীফ বলা হয়।
দুরুদ আরবিতে কী?
দুরুদ শব্দটিকে আরবিতে 'সালাত' (صلاة) বা বহুবচনে 'সালাওয়াত' বলা হয়। যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সালাত বলা হয়, তার অর্থ রহমত বর্ষণ করা; ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে বলা হলে তার অর্থ দোয়া বা ক্ষমা প্রার্থনা করা; আর মুমিনদের পক্ষ থেকে বলা হলে তার অর্থ নবীজির জন্য সম্মান ও রহমত কামনা করা।
২. দুরুদ কত প্রকার এবং দুরুদ শরীফ সমূহ
অনেকেই জানতে চান, দুরুদ কত প্রকার? ইসলামি স্কলারদের মতে, দুরুদের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা প্রকারভেদ নেই। তবে উৎপত্তিগত দিক থেকে দুরুদকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
- ১. মাসনুন দুরুদ: যেগুলো স্বয়ং নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন (যেমন: দুরুদে ইব্রাহিম)।
- ২. গাইরে মাসনুন দুরুদ: যেগুলো পরবর্তী যুগে সাহাবি, তাবেয়ি বা বড় বড় আলেমগণ নবীজির প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ রচনা করেছেন (যেমন: দুরুদে তাজ, দুরুদে মাহি ইত্যাদি)।
সার্চ ইঞ্জিনে অনেকেই বিভিন্ন দুরুদ শরীফ সমূহ লিখে খোঁজেন। সব দুরুদের মূল উদ্দেশ্য একটাই— নবীজির প্রতি সালাম ও দরুদ পেশ করা। নিচে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল পঠিত দুরুদগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
৩. নামাজের দুরুদ শরীফ (দুরুদে ইব্রাহিম)
দুরুদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ হলো দুরুদ শরীফ ইব্রাহিম। এটি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের শিখিয়েছিলেন। যারা দুরুদ শরীফ নামাজের জন্য খুঁজছেন, তাদের জন্য নিচে আরবি উচ্চারণ ও অর্থসহ দুরুদ শরীফ বাংলা দেওয়া হলো:
বাংলা উচ্চারণ:
"আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।"
অর্থ:
"হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করেছিলেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করেছিলেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত।"
(এই দুরুদটি নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর পড়তে হয়)।
৪. সবচেয়ে ছোট দুরুদ শরীফ কোনটি?
কর্মব্যস্ত জীবনে অনেকেই বেশি বেশি দুরুদ পাঠ করতে চান, কিন্তু সময়ের অভাবে লম্বা দুরুদ পড়তে পারেন না। তাই তারা গুগলে কোনটি ছোট দুরুদ?, ছোট দুরুদ শরীফ অথবা সবচেয়ে ছোট দুরুদ শরীফ লিখে খোঁজেন।
সবচেয়ে ছোট এবং সহজে মুখস্থ করার মতো দুরুদটি হলো:
صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم
উচ্চারণ: "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম"
অর্থ: "আল্লাহ তাআলা তাঁর (নবীজির) ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।"
আপনি চাইলে আরও একটি ছোট দুরুদ পড়তে পারেন:
উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ।"
অর্থ: "হে আল্লাহ, আমাদের নবী মুহাম্মদের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।"
হাঁটতে চলতে, কাজের ফাঁকে বা অবসর সময়ে এই ছোট দুরুদগুলো প্রতিনিয়ত পাঠ করলে অগণিত সওয়াব লাভ করা যায়।
৫. নবীজির দুরুদ শরীফ পাঠের ফজিলত ও গুরুত্ব
নবীজির দুরুদ শরীফ পাঠের ফজিলত হাদিস শরিফে ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর কয়েকটি প্রধান ফজিলত হলো:
আল্লাহর রহমত লাভ:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দুরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন, তার ১০টি গুনাহ ক্ষমা করবেন এবং তার ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।" (নাসায়ি)।
কিয়ামতের দিন নবীজির নৈকট্য:
কিয়ামতের কঠিন ময়দানে সেই ব্যক্তিই নবীজির সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবেন, যে দুনিয়াতে তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি দুরুদ পাঠ করেছে।
দুশ্চিন্তা দূর হয়:
এক সাহাবি নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি যদি তার সবটুকু দোয়া দুরুদ পাঠের জন্য নির্ধারণ করেন, তবে কেমন হবে? নবীজি (সা.) বললেন, "তাহলে তোমার সব দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন এবং তোমার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।" (তিরমিজি)।
৬. দুরুদ শরীফ দোয়া হিসেবে কখন পড়বেন?
অনেকেই দুরুদ শরীফ দোয়া কবুলের মাধ্যম হিসেবে সম্পর্কে জানতে চান। ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, যেকোনো দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দোয়ার আগে ও পরে দুরুদ শরীফ পাঠ করা।
হযরত উমর (রা.) বলেন, "দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে, এর কোনো অংশই আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না, যতক্ষণ না তুমি তোমার নবীর ওপর দুরুদ পাঠ করো।" (তিরমিজি)। তাই মোনাজাত বা দোয়া করার সময় শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা (আলহামদুলিল্লাহ) এবং দুরুদ শরীফ পড়ে দোয়া শুরু করা এবং শেষেও দুরুদ পড়ে মোনাজাত শেষ করা সুন্নত।
উপসংহার
দুরুদ শরীফ হলো মুমিন জীবনের এক অমূল্য রত্ন। এটি কেবল নামাজের অংশই নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে রহমতপূর্ণ করার এক জাদুকরি আমল। জুমার দিনে দুরুদ পাঠের ফজিলত আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই বড় দুরুদ পড়ার সময় না পেলেও, অন্তত সবচেয়ে ছোট দুরুদটি ("সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম") সারাদিন জিকির হিসেবে পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।