IslamArc
Prayer

ঈদের নামাজ: পড়ার নিয়ম, নিয়ত, রাকাত এবং তাকবীর সংখ্যা (৬ ও ১২ তাকবীর)

ঈদের নামাজ কি, কয় রাকাত, ৬ তাকবির নাকি ১২ তাকবির, আরবি ও বাংলা নিয়ত, হানাফি ও আহলে হাদিস নিয়ম এবং মহিলাদের বিধান — পূর্ণাঙ্গ বাংলা গাইড।

মুসলিম উম্মাহর জন্য বছরে দুটি সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন হলো ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। এই দুই দিন সকালে সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য ঈদের নামাজ আদায় করা এক বিশেষ ইবাদত ও আনন্দের অংশ।

গুগল সার্চে অনেকেই ঈদের নামাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় জানতে চান, যেমন— "ঈদের নামাজ কি", "ঈদের নামাজ কি ওয়াজিব", "ঈদের নামাজ কয় রাকাত", "ঈদের নামাজ ৬ তাকবির নাকি ১২ তাকবির?", এবং "ঈদের নামাজের নিয়ম মহিলাদের"। আপনাদের মনের সকল প্রশ্নের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের এই পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।

১. ঈদের নামাজ কি এবং এর বিধান (ফরজ নাকি ওয়াজিব?)

ঈদের নামাজ কি? ঈদের নামাজ হলো বছরে দুইবার (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সকালে) মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্মিলিতভাবে আদায় করা এক বিশেষ সালাত। এর মাধ্যমে মাসব্যাপী রোজা বা কুরবানির ত্যাগের পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

ঈদের নামাজ পড়া কি ফরজ নাকি ওয়াজিব? হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, যাদের ওপর জুমার নামাজ ফরজ, তাদের ওপর ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। তবে অন্যান্য কিছু মাজহাবে একে 'ফরজে কিফায়া' বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলা হয়েছে।

ঈদের নামাজ না পড়লে কি গুনাহ হবে? যেহেতু এটি ওয়াজিব (বা ফরজে কিফায়া), তাই ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা কারণে বা অবহেলা করে ঈদের জামাত ত্যাগ করা গুনাহের কাজ। তবে কেউ যদি অসুস্থতা বা শরয়ি কোনো ওজরের কারণে পড়তে না পারেন, তবে তার গুনাহ হবে না।

২. ঈদের সালাত কত রাকাত এবং তাকবীর কয়টি?

ঈদের সালাত কত রাকাত? এবং ঈদের নামাজ কয় রাকাত? ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা—উভয় ঈদের নামাজই মূলত ২ রাকাত। এতে কোনো আজান বা ইকামত নেই।

ঈদের নামাজে অতিরিক্ত তাকবীর কয়টি? সাধারণ নামাজের সাথে ঈদের নামাজের মূল পার্থক্য হলো অতিরিক্ত তাকবীর।

ঈদের নামাজ ৬ তাকবির নাকি ১২ তাকবির?

এটি নির্ভর করে মাজহাব বা অনুসরণীয় ফিকহের ওপর:

৬ তাকবীর: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী (যা বাংলাদেশ ও উপমহাদেশে সর্বাধিক প্রচলিত), ঈদের নামাজে অতিরিক্ত তাকবীর হলো ৬টি।

১২ তাকবীর: আহলে হাদিস, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের অনুসারীরা হাদিসের ভিন্ন বর্ণনার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ১২ তাকবীরে ঈদের নামাজ আদায় করেন (প্রথম রাকাতে ৭টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে ৫টি)।

৩. ঈদের নামাজের নিয়ত (আরবি ও বাংলা)

যে কোনো ইবাদতের মূল হলো নিয়ত। অনলাইনে অনেকেই ঈদুল ফিতর নামাজের নিয়ত কী? এবং ঈদের নামাজের নিয়ত আরবিতে কী? তা লিখে খোঁজেন।

ঈদুল ফিতরের নামাজের আরবি নিয়ত

"নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা, রাকয়াতাই সালাতি ইদিল ফিতরি (বা আজহা), মাআ সিত্তাতি তাকবিরাতি ওয়াজিবুল্লাহি তাআলা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি, ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমাম, আল্লাহু আকবার।"

ঈদুল ফিতর নামাজের বাংলা নিয়ত

আরবি নিয়ত মুখস্থ না থাকলে বাংলায় মনে মনে নিয়ত করলেও নামাজ হয়ে যাবে:

"আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ঈদুল ফিতরের (বা ঈদুল আজহার) দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ ৬টি অতিরিক্ত তাকবীরের সাথে এই ইমামের পেছনে কিবলামুখী হয়ে আদায় করার নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।"

৪. ছয় তাকবীরে ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম (হানাফি নিয়ম)

উপমহাদেশের অধিকাংশ মসজিদে ৬ তাকবীরে নামাজ পড়া হয়। ছয় তাকবীরে ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:

প্রথম রাকাত

১. নিয়ত করে ইমামের সাথে 'আল্লাহু আকবার' বলে হাত বাঁধুন।

২. এরপর নিঃশব্দে ছানা ('সুবহানাকাল্লাহুম্মা...') পড়ুন।

৩. ছানা পড়ার পর ইমাম সাহেব পরপর ৩টি অতিরিক্ত তাকবীর দেবেন। প্রথম ও দ্বিতীয় তাকবীরে কান পর্যন্ত হাত তুলে ছেড়ে দিন। তৃতীয় তাকবীরে কান পর্যন্ত হাত তুলে সাধারণ নামাজের মতো বুকের/নাভির নিচে হাত বাঁধুন।

৪. এরপর ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়বেন। আপনি চুপ করে শুনবেন এবং এরপর ইমামের সাথে রুকু ও সিজদা করে প্রথম রাকাত শেষ করবেন।

দ্বিতীয় রাকাত

৫. দ্বিতীয় রাকাতে উঠে ইমাম সাহেব প্রথমে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা তিলাওয়াত করবেন।

৬. সূরা তিলাওয়াত শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে ইমাম সাহেব আবার ৩টি অতিরিক্ত তাকবীর দেবেন। এই ৩ বারই কান পর্যন্ত হাত তুলে ছেড়ে দেবেন (হাত বাঁধবেন না)।

৭. এরপর ৪র্থ তাকবীরটি ('আল্লাহু আকবার') বলে হাত না তুলে সরাসরি রুকুতে চলে যাবেন।

৮. এরপর সাধারণ নামাজের মতোই সিজদা ও শেষ বৈঠক করে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।

(নামাজ শেষে ইমাম সাহেবের দুটি খুতবা শোনা ওয়াজিব। খুতবা না শুনে মসজিদ/ঈদগাহ ত্যাগ করা অনুচিত)।

৫. ১২ তাকবীরে ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম (আহলে হাদিস নিয়ম)

অনেকেই ১২ তাকবীরে ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম সম্পর্কে জানতে চান।

প্রথম রাকাত

তাকবিরে তাহরিমা (আল্লাহু আকবার) বলে হাত বাঁধার পর ছানা পড়বেন। এরপর সূরা ফাতিহা পড়ার আগে ইমাম সাহেব অতিরিক্ত ৭টি তাকবীর দেবেন (প্রতিবার হাত তুলে ছেড়ে দিতে হয় বা বাঁধতে হয়, স্কলারদের ভিন্ন ভিন্ন মত আছে)। এরপর সূরা মিলিয়ে রুকু-সিজদা করবেন।

দ্বিতীয় রাকাত

সিজদা থেকে ওঠার তাকবীরের পর এবং সূরা ফাতিহা পড়ার আগে ৫টি অতিরিক্ত তাকবীর দেওয়া হয়। এরপর সূরা মিলিয়ে সাধারণ নিয়মে নামাজ শেষ করতে হয়।

৬. মহিলাদের ঈদের নামাজ

ঈদের নামাজের নিয়ম মহিলাদের ক্ষেত্রে পুরুষদের নিয়মের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপট রাখে।

  • পুরুষদের মতো মহিলাদের ওপর ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব নয়।
  • তবে যদি কোনো ঈদগাহে বা মসজিদে মহিলাদের জন্য পর্দার সাথে সম্পূর্ণ আলাদা ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকে, তবে মহিলারা সেখানে গিয়ে জামাতে শরিক হতে পারবেন।
  • ঈদগাহে গেলে পুরুষদের পেছনে দাঁড়িয়ে ইমামকে অনুসরণ করে হুবহু একই নিয়মে (৬ বা ১২ তাকবীরে) নামাজ আদায় করবেন।
  • যারা বাসায় থাকেন, তারা একাকী ঈদের নামাজ পড়বেন না (হানাফি মাজহাব মতে একাকী ঈদের নামাজ নেই)। এর বদলে তারা বাসায় ইশরাক বা চাশতের ২ বা ৪ রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিতে পারেন।

উপসংহার

ঈদের নামাজ মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন। তাকবীরের ধ্বনিতে ঈদগাহ মুখরিত করে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করার মাধ্যমে আমরা ঈদের দিনটি শুরু করি। সঠিক নিয়ম ও তাকবীরের বিধান জেনে নামাজ আদায় করলে ইবাদতে পূর্ণতা আসে।