IslamArc
Prayer

এশার নামাজ: পড়ার নিয়ম, রাকাত সংখ্যা (৯ ও ১৭ রাকাত), সময় এবং মহিলাদের নিয়ম

এশার নামাজ কয়টায়, ১৭ রাকাত ও ৯ রাকাত কি কি, বিতর নামাজের নিয়ম, দোয়া কুনুত এবং মহিলাদের নিয়ম — সম্পূর্ণ বাংলা গাইড।

সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতের শান্ত পরিবেশে মহান আল্লাহর দরবারে মাথা নত করার এক অপূর্ব মাধ্যম হলো এশার নামাজ। এটি দিনের পঞ্চম এবং শেষ ফরজ নামাজ। রাতের বেলায় ঘুমের আগে এই নামাজ আদায় করা মুমিনদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুগল সার্চে অনেকেই "এশার নামাজ ১৭ রাকাত পড়ার নিয়ম", "এশার নামাজ ৯ রাকাত কি কি", "মহিলাদের এশার নামাজ পড়ার নিয়ম" এবং "এশার নামাজ কয়টায়" লিখে খোঁজেন। আপনাদের সকল প্রশ্নের বিস্তারিত ও সঠিক উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের এই পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।

১. এশার নামাজ কয়টায় এবং ওয়াক্ত কখন শুরু হয়?

শুরুর সময়: পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্তের পর যে লাল আভা (শাফাক) থাকে, তা সম্পূর্ণ দূর হয়ে রাতের অন্ধকার নেমে এলে এশার ওয়াক্ত শুরু হয়। সাধারণত মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পরপরই এশার নামাজের সময় শুরু হয়।

শেষ সময়: এশার নামাজ সুবহে সাদিক (ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ) পর্যন্ত পড়া যায়।

উত্তম সময়: রাতের এক-তৃতীয়াংশ বা মধ্যরাতের আগেই এশার নামাজ আদায় করে নেওয়া উত্তম। বিনা কারণে এশার নামাজ মধ্যরাতের পর পর্যন্ত দেরি করা মাকরুহ।

২. এশার নামাজ কয় রাকাত ও কি কি? (১৭ রাকাত বনাম ৯ রাকাত)

এশার নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে। গুগলে প্রচুর মানুষ "এশার নামাজ ১৭ রাকাত" এবং "এশার নামাজ ৯ রাকাত কি কি" লিখে সার্চ করেন। আসুন বিষয়টি পরিষ্কার করে জেনে নিই।

এশার নামাজ মূলত ১৭ রাকাত। নিচে এর বিস্তারিত ধারাবাহিক ছক দেওয়া হলো:

নামাজের ধরন রাকাত সংখ্যা বিবরণ
সুন্নত (গাইরে মুয়াক্কাদাহ) ৪ রাকাত ফরজের আগে পড়তে হয়। এটি পড়লে সওয়াব আছে, না পড়লে গুনাহ নেই।
ফরজ ৪ রাকাত এটি মূল নামাজ এবং সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক।
সুন্নত (মুয়াক্কাদাহ) ২ রাকাত ফরজের পর পড়তে হয়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নফল ২ রাকাত সুন্নতের পর পড়তে হয়।
বিতর (ওয়াজিব) ৩ রাকাত এটি পড়া ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক)।
নফল ২ রাকাত বিতরের পর পড়তে হয় (ঐচ্ছিক)।
মোট ১৭ রাকাত সম্পূর্ণ এশার নামাজ।

এশার নামাজ ৯ রাকাত কি কি?

অনেকেই জানতে চান এশার নামাজ ৯ রাকাত কোনগুলো। মূলত সময়ের অভাব, অসুস্থতা বা ক্লান্তির কারণে যদি কেউ ঐচ্ছিক নামাজগুলো (গাইরে মুয়াক্কাদাহ ও নফল) ছেড়ে দেন, তবে তাকে অন্তত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৯ রাকাত নামাজ অবশ্যই আদায় করতে হবে।

এই ৯ রাকাত হলো: ৪ রাকাত ফরজ + ২ রাকাত সুন্নত (মুয়াক্কাদাহ) + ৩ রাকাত বিতর = মোট ৯ রাকাত।

৩. এশার নামাজ পড়ার নিয়ম (১৭ রাকাত পড়ার নিয়ম)

অনেকেই এশার নামাজ পড়ার নিয়ম বা এশার নামাজ ১৭ রাকাত পড়ার নিয়ম সম্পর্কে জানতে চান। অন্যান্য ওয়াক্তের মতো এশাতেও সাধারণ নিয়মেই নামাজ পড়তে হয়। তবে এখানে ৪ রাকাত ফরজ এবং ৩ রাকাত বিতর পড়ার নিয়মটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

৪ রাকাত ফরজ নামাজ পড়ার নিয়ম

প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাত: নিয়ত করে ছানা পড়বেন। এরপর সূরা ফাতিহার সাথে অন্য কোনো সূরা বা আয়াত মিলিয়ে রুকু-সিজদা করবেন। দ্বিতীয় রাকাত শেষে বসে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পড়বেন।

তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাত: তাশাহহুদ পড়ে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবেন। তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়বেন, অন্য কোনো সূরা মেলাবেন না। চতুর্থ রাকাতের সিজদা শেষে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দরুদ শরিফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরাবেন।

(বি.দ্র: এশার আগের ৪ রাকাত সুন্নত পড়ার সময় চার রাকাতেই সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মেলাতে হয়।)

৪. ৩ রাকাত বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম এবং দোয়া কুনুত

এশার নামাজের সবচেয়ে বিশেষ অংশ হলো বিতর নামাজ, যা ওয়াজিব। এটি সাধারণ নামাজের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।

প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাত

সাধারণ নামাজের মতোই সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলিয়ে পড়বেন এবং দ্বিতীয় রাকাত শেষে বসে তাশাহহুদ পড়বেন।

তৃতীয় রাকাত

তাশাহহুদ পড়ে উঠে দাঁড়াবেন। সূরা ফাতিহার সাথে অন্য একটি সূরা মেলাবেন। সূরা মেলানোর পর রুকুতে না গিয়ে, পুনরায় 'আল্লাহু আকবার' বলে তাকবিরে তাহরিমার মতো দুই হাত কান পর্যন্ত তুলে আবার হাত বাঁধবেন।

দোয়া কুনুত

হাত বাঁধার পর নিঃশব্দে 'দোয়া কুনুত' পড়বেন। (দোয়া কুনুত মুখস্থ না থাকলে 'রাব্বানা আতিনা ফিদদুনিয়া...' অথবা ৩ বার 'আল্লাহুম্মাগফিরলি' পড়তে পারেন)।

দোয়া কুনুত পড়া শেষ হলে 'আল্লাহু আকবার' বলে রুকুতে যাবেন এবং সাধারণ নিয়মে সিজদা ও শেষ বৈঠক করে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।

৫. মহিলাদের এশার নামাজ পড়ার নিয়ম

সার্চে অন্যতম একটি বিষয় হলো "মহিলাদের এশার নামাজ পড়ার নিয়ম"। নামাজ আদায়ের মূল ভিত্তি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এক। তবে পর্দা ও শালীনতার খাতিরে মহিলাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে:

হাত তোলা ও বাঁধা: মহিলারা তাকবির বলার সময় হাত কাঁধ বা বুক পর্যন্ত তুলবেন (পুরুষদের মতো কান পর্যন্ত নয়) এবং বুকের ওপর হাত বাঁধবেন (ডান হাত বাম হাতের ওপর থাকবে)।

রুকু করা: রুকুতে পিঠ একেবারে সোজা বা টানটান করার প্রয়োজন নেই। মহিলারা হাঁটু সামান্য বাঁকা করে, দুই হাত দিয়ে হাঁটু চেপে ধরবেন। হাতের আঙুলগুলো স্বাভাবিকভাবে মিলানো থাকবে।

সিজদা করা: সিজদাতে মহিলারা শরীর যতটা সম্ভব গুটিয়ে রাখবেন। পেট উরুর সাথে এবং বাহু পাঁজরের সাথে মিলিয়ে মাটির সাথে মিশে সিজদা করবেন।

বসার নিয়ম: তাশাহহুদের সময় বসার ক্ষেত্রে মহিলারা উভয় পা ডান দিকে বের করে দিয়ে নিতম্বের ওপর (মাটিতে) বসবেন।

উপসংহার

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি এশার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত ইবাদত করল। আর যে ফজরও জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারারাত ইবাদত করল।" (সহিহ মুসলিম)।

রাতের বেলা পবিত্র হয়ে, ওজু করে এশার নামাজ আদায় করে ঘুমাতে যাওয়া একজন মুমিনের জীবনে প্রশান্তি ও রহমত নিয়ে আসে। বিতরসহ সম্পূর্ণ নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আমরা সারাদিনের পাপ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারি এবং এক সুন্দর সকালের জন্য প্রার্থনা করতে পারি।