ইসলামে কোনো মুসলিম ভাই বা বোনের মৃত্যুর পর তার রুহের মাগফিরাত কামনার জন্য সর্বশেষ যে ইবাদতটি সম্মিলিতভাবে আদায় করা হয়, তা হলো জানাজার নামাজ। এটি মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার একটি বিশেষ দোয়া। জানাজার নামাজ আদায় করা 'ফরজে কিফায়া' (অর্থাৎ সমাজের কয়েকজন আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু কেউই না পড়লে সবাই গুনাহগার হবে)।
গুগলে অনেকেই জানাজার নামাজ নিয়ে নানা বিষয় লিখে সার্চ করেন। যেমন— "জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম", "জানাজার নামাজের নিয়ত ও দোয়া", "জানাজার নামাজের আরবি নিয়ত", "জানাজার নামাজের নিয়ত বাংলায়" এবং "জানাজার নামাজের দোয়া সমূহ pdf"। আপনাদের এই সকল জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর এবং "জানাজার নামাজের নিয়ম দলিলসহ" বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।
১. জানাজার নামাজের নিয়ত (আরবি ও বাংলায়)
যে কোনো নামাজের মতো জানাজার নামাজের জন্যও নিয়ত করা আবশ্যক। অনেকেই অনলাইনে "জানাজার নামাজের আরবি নিয়ত" এবং "জানাজার নামাজের নিয়ত বাংলায়" খুঁজে থাকেন।
আরবি নিয়ত
"নাওয়াইতু আন উয়াদ্দিয়া লিল্লাহি তাআলা আরবাআ তাকবীরাতি সালাতিল জানাজাতি ফারজুল কিফায়াতি, ছানাউ লিল্লাহি তাআলা ওয়াস সালাতু আলান নাবিয়্যি ওয়াদ দুআউ লিহাজাল মাইয়্যিতি (মৃত ব্যক্তি নারী হলে 'লিহাজিহিল মাইয়্যিতাতি') ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমাম, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি— আল্লাহু আকবার।"
বাংলা নিয়ত
আরবি নিয়ত মুখস্থ না থাকলে বাংলায় মনে মনে নিয়ত করলেও নামাজ হয়ে যাবে:
"আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ফরজে কিফায়া জানাজার নামাজ চার তাকবীরের সাথে এই ইমামের পেছনে কিবলামুখী হয়ে আদায় করার নিয়ত করছি। এই নামাজে আল্লাহর প্রশংসা, নবীজির ওপর দরুদ এবং এই মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করছি— আল্লাহু আকবার।"
২. জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম
জানাজার নামাজে কোনো রুকু বা সিজদা নেই, পুরো নামাজটি দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয়। "জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম" ধাপে ধাপে নিচে দেওয়া হলো:
প্রথম তাকবীর: ইমাম সাহেব 'আল্লাহু আকবার' বলে প্রথম তাকবীর দেবেন। আপনিও ইমামের সাথে হাত তুলে তাকবীরে তাহরিমা বেঁধে (বুকের/নাভির নিচে) ছানা পড়বেন।
দ্বিতীয় তাকবীর: এরপর ইমাম সাহেব হাত না তুলেই দ্বিতীয় তাকবীর দেবেন। এই তাকবীরের পর দরুদ শরিফ (নামাজে পঠিত দরুদে ইবরাহিম) পড়তে হয়।
তৃতীয় তাকবীর: দ্বিতীয় তাকবীরের মতো হাত না তুলেই ইমাম সাহেব তৃতীয় তাকবীর দেবেন। এই তাকবীরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত "জানাজার নামাজের আরবি দোয়া" পড়তে হয়।
চতুর্থ তাকবীর ও সালাম: ইমাম সাহেব চতুর্থ তাকবীর দেওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ থেকে ডান দিকে এবং বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।
৩. জানাজার নামাজের আরবি দোয়া সমূহ
অনেকেই পুরো নামাজ পড়ার জন্য "জানাজার নামাজের দোয়া সমূহ pdf" ডাউনলোড করতে চান। আপনাদের সুবিধার্থে "জানাজার নামাজের আরবি দোয়া" ও এর ধারাবাহিকতা এখানে দেওয়া হলো:
১. ছানা (প্রথম তাকবীরের পর)
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاؤُكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: "সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা ছানাউকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।"
(জানাজার ছানায় 'ওয়া জাল্লা ছানাউকা' যুক্ত করতে হয়)।
২. দরুদ শরিফ (দ্বিতীয় তাকবীরের পর)
নামাজে আমরা যে 'দরুদে ইবরাহিম' (আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ...) পড়ি, সেটিই পড়তে হবে।
৩. মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া (তৃতীয় তাকবীরের পর)
মৃত ব্যক্তি যদি প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ হন, তবে এই দোয়াটি পড়তে হয়:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيمَانِ
উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মাগফির লিহাইয়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ও সাগিরিনা ও কাবিরিনা ও জাকারিনা ও উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফফাহু আলাল ঈমান।"
(অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বা মেয়ের জন্য দোয়ার ভিন্নতা রয়েছে। ছেলের ক্ষেত্রে 'আল্লাহুম্মাজ আলহু লানা ফারাতাও...' এবং মেয়ের ক্ষেত্রে 'আল্লাহুম্মাজ আলহা লানা ফারাতাও...' দিয়ে শুরু হওয়া দোয়াটি পড়তে হয়)।
৪. জানাজার নামাজের নিয়ম দলিলসহ এবং আহলে হাদিস মত
ইন্টারনেটে অনেকেই "জানাজার নামাজের নিয়ম দলিলসহ" এবং "জানাজার নামাজের নিয়ম আহলে হাদিস" লিখে খোঁজেন, কারণ মাজহাব ও ফিকহ অনুযায়ী তাকবীরের সময় হাত তোলার ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
হানাফি মাজহাবের নিয়ম
হানাফি মাজহাব (যা উপমহাদেশে বেশি প্রচলিত) অনুযায়ী, জানাজার নামাজে কেবল প্রথম তাকবীরের সময় কান পর্যন্ত হাত তুলতে হয় (রাফউল ইয়াদাইন)। বাকি তিন তাকবীরে হাত তুলতে হয় না। এর দলিল হিসেবে তাঁরা ইবনে মাসউদ (রা.) ও অন্যান্য সাহাবিদের আমল পেশ করেন, যেখানে বারবার হাত তোলার কথা বলা হয়নি। তাছাড়া প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহার বদলে ছানা পড়াকেই এই মাজহাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
আহলে হাদিস/শাফেয়ি/হাম্বলি নিয়ম
"জানাজার নামাজের নিয়ম আহলে হাদিস" অনুযায়ী, প্রথম তাকবীরের পর ছানার পাশাপাশি সূরা ফাতিহা পড়া সুন্নত। তাছাড়া, তাঁরা চার তাকবীরের প্রতিটিতেই কাঁধ বা কান পর্যন্ত হাত তুলে (রাফউল ইয়াদাইন করে) তাকবীর দেন। এর স্বপক্ষে তাঁরা সহিহ বুখারি ও ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন, যেখানে নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের জানাজায় সূরা ফাতিহা পড়া এবং বারবার হাত তোলার কথা রয়েছে।
উভয় পদ্ধতিই সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। আপনি যে মাজহাব বা মতাদর্শ অনুসরণ করেন, সে অনুযায়ী নামাজ আদায় করলে তা সহীহ বলে গণ্য হবে।
উপসংহার
জানাজার নামাজ মূলত মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একজন মুসলিম পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তার অন্য ভাইয়েরা আল্লাহর দরবারে তার ক্ষমার জন্য যে আকুতি জানান, তা ইসলামি সমাজের এক অপূর্ব সৌন্দর্য। তাই সঠিক নিয়ম, নিয়ত ও দোয়াগুলো শিখে রাখা আমাদের সকলের জন্য অত্যন্ত জরুরি।