IslamArc
Ramadan

তারাবির নামাজ: পড়ার নিয়ম, রাকাত সংখ্যা, দোয়া ও মোনাজাত

তারাবির নামাজ কি, কত রাকাত (৮ নাকি ২০), পড়ার সঠিক নিয়ম, ৪ রাকাত পর পর দোয়া এবং মোনাজাত — রমজানের তারাবিহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বাংলা গাইড।

পবিত্র মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসের অন্যতম প্রধান ও বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। সারাদিন রোজা রাখার পর রাতের বেলায় দীর্ঘ সময় নিয়ে এই নামাজ আদায় করা হয়।

গুগল সার্চে অনেকেই তারাবির নামাজ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। যেমন— "তারাবির নামাজ কি", "তারাবির নামাজ কত রাকাত পড়তে হয়?", "তারাবীহ কি ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত?", "তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম" ইত্যাদি। আপনাদের মনের সকল প্রশ্নের বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য উত্তর নিয়েই আজকের এই পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকাটি তৈরি করা হয়েছে।

১. তারাবির নামাজ কি এবং কবে থেকে শুরু?

তারাবির নামাজ কি? 'তারাবিহ' (تراويح) শব্দটি আরবি 'তারবিহাতুন' শব্দের বহুবচন, যার অর্থ হলো বিশ্রাম নেওয়া বা প্রশান্তি লাভ করা। রমজান মাসে এশার নামাজের পর দীর্ঘ তিলাওয়াতের মাধ্যমে নামাজ আদায় করে প্রতি চার রাকাত পরপর বসে বিশ্রাম নেওয়া হয় বলে একে 'তারাবির নামাজ' বলা হয়।

তারাবির নামাজ কবে থেকে শুরু? রমজান মাসের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে তারাবির নামাজ শুরু হয়। যেদিন সন্ধ্যায় রমজানের চাঁদ দেখা যায়, সেই রাতেই এশার নামাজের পর থেকে তারাবির নামাজ পড়া শুরু করতে হয় (অর্থাৎ রোজার আগের রাত থেকে)। আর ঈদের চাঁদ দেখার রাতে তারাবি পড়তে হয় না।

২. তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল?

অনেকেই জানতে চান, তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল?

ইসলামি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্যই তারাবির নামাজ পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এটি সাধারণ নফল নামাজের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে কিয়াম করবে (তারাবি পড়বে), তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।" (সহিহ বুখারি)।

বিনা ওজরে এই নামাজ ছেড়ে দেওয়া অনুচিত।

৩. তারাবির নামাজ কত রাকাত? (৮ নাকি ২০ রাকাত?)

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা দেখা যায়। অনেকেই সার্চ করেন, "তারাবির নামাজ কত রাকাত", "তারাবীহ কি ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত?" এবং "তারাবির নামাজ ৮ রাকাত পড়া যাবে কি"।

২০ রাকাতের বিধান

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ থেকে, বিশেষ করে হজরত উমর (রা.)-এর সময় থেকে মসজিদে নববিতে ২০ রাকাত তারাবিহ জামাতের সাথে পড়ার প্রচলন শুরু হয়, যা মক্কা-মদিনা সহ বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম (হানাফি, শাফেয়ি, হাম্বলি মাজহাব) আজও অনুসরণ করেন। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের প্রায় সব মসজিদে ২০ রাকাত তারাবিহ পড়া হয়।

৮ রাকাতের বিধান

আহলে হাদিস বা সালাফি মতাদর্শের আলেমরা সহিহ বুখারির একটি হাদিসের (যেখানে নবীজির রাতের নামাজের কথা বলা হয়েছে) ওপর ভিত্তি করে ৮ রাকাত তারাবিহ (এবং ৩ রাকাত বিতর) পড়ার পক্ষে মত দেন।

সিদ্ধান্ত

আপনি যদি ২০ রাকাত পড়েন, সেটি উত্তম ও সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত। আর যদি শারীরিক অসুস্থতা বা ক্লান্তির কারণে ৮ রাকাত পড়েন, তবে তারাবির নামাজ ৮ রাকাত পড়া যাবে এবং নামাজ আদায় হয়ে যাবে।

৪ রাকাত তারাবিহ পড়া যাবে কি?

কেউ যদি অত্যন্ত ক্লান্ত বা অসুস্থ থাকেন এবং মাত্র ৪ রাকাত পড়ে আর না পারেন, তবে ওই ৪ রাকাতের সওয়াব তিনি পাবেন। তবে পূর্ণাঙ্গ তারাবিহ বলতে ২০ বা অন্তত ৮ রাকাতকেই বোঝায়। ইচ্ছাকৃতভাবে মাত্র ৪ রাকাত পড়ে ছেড়ে দেওয়া সুন্নাহর পরিপন্থী।

৪. তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম ও সূরা

তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম অন্যান্য সাধারণ সুন্নত বা নফল নামাজের মতোই।

পড়ার নিয়ম

এশার ৪ রাকাত ফরজ এবং ২ রাকাত সুন্নতের পর তারাবির নামাজ শুরু করতে হয়। ২ রাকাত করে করে এই নামাজ আদায় করতে হয়। প্রতি ২ রাকাত অন্তর সালাম ফেরাতে হয় এবং প্রতি ৪ রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নিতে হয়।

তারাবিতে কোন সূরা পড়তে হয়?

তারাবির নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সূরা নির্ধারিত নেই। পবিত্র কুরআনের যেকোনো স্থান থেকে তিলাওয়াত করা যায়। মসজিদে সাধারণত হাফেজ সাহেবরা পুরো কুরআন খতম করেন (খতম তারাবিহ)। আর যারা বাসায় একা পড়েন বা সূরা তারাবিহ পড়েন, তারা সূরা ফিল বা সূরা তীন থেকে শুরু করে সূরা নাস পর্যন্ত ছোট সূরাগুলো দিয়ে ২ রাকাত করে নামাজ আদায় করতে পারেন।

তারাবির নামাজের নিয়ত (বাংলায়)

"আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারাবির ২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ নামাজ কিবলামুখী হয়ে আদায় করার নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।" (জামাতে পড়লে যুক্ত করবেন: "এই ইমামের পেছনে")।

৫. তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত

প্রতি ৪ রাকাত তারাবিহ পড়ার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সময় দোয়া ও জিকির করা মুস্তাহাব। অনেকেই গুগলে "তারাবির নামাজের দোয়া" এবং "তারাবির নামাজের মোনাজাত" লিখে খোঁজেন।

তারাবির নামাজের দোয়া (৪ রাকাত পরপর পড়ার দোয়া)

আমাদের দেশে প্রতি ৪ রাকাত পর পর একটি সুনির্দিষ্ট দোয়া পড়ার প্রচলন রয়েছে:

سُبْحَانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ، سُبْحَانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوتِ، سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوتُ أَبَدًا أَبَدَ، سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ

উচ্চারণ: সুব্হানাযিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুব্হানাযিল ইয্যাতি ওয়াল আযমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়ায়ি ওয়াল জাবারুত। সুব্হানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা-ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামুতু, আবাদান আবাদা; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রুহ।

(নোট: এই দোয়াটি হাদিস দ্বারা সরাসরি প্রমাণিত না হলেও, এর অর্থ অত্যন্ত চমৎকার এবং আল্লাহর প্রশংসামূলক হওয়ায় এটি পড়া দূষণীয় নয়। আপনি চাইলে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি জিকিরও করতে পারেন)।

তারাবির নামাজের মোনাজাত

আমাদের সমাজে ২০ রাকাত তারাবিহ শেষে একটি সম্মিলিত মোনাজাত করার প্রচলন আছে:

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَنَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা, ওয়া নাউজুবিকা মিনান্নার। ইয়া খালিকাল জান্নাতি ওয়ান্নার, বিরাহমাতিকা ইয়া আজিজু, ইয়া গাফফারু, ইয়া কারিমু, ইয়া সাত্তারু, ইয়া রাহিমু, ইয়া জাব্বারু, ইয়া খালিকু, ইয়া বাররু। আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান্নার; ইয়া মুজিরু, ইয়া মুজিরু, ইয়া মুজির। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।

(এই মোনাজাতটিও হাদিসে সরাসরি উল্লেখ নেই। আপনি আপনার নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে আল্লাহর কাছে যেকোনো দোয়া বা মোনাজাত করতে পারেন। আল্লাহ সকল ভাষার দোয়াই কবুল করেন।)

উপসংহার

রমজানের রাতগুলোকে ইবাদতে ভরিয়ে তোলার জন্য তারাবির নামাজ এক অনন্য সুযোগ। ২০ রাকাত হোক বা ৮ রাকাত, মূল বিষয় হলো আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা, বিনয় এবং কুরআনের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শোনা বা পড়া। বিতর নামাজ সাধারণত তারাবির পরপরই জামাতের সাথে পড়া হয়।