IslamArc
Faith & Belief

যাকাত: কাকে বলে, নিসাব, বন্টনের খাত এবং প্রদানের বিস্তারিত নিয়ম

যাকাতের অর্থ, নিসাব, কাদের ওপর ফরজ, ৮টি বন্টনের খাত এবং প্রদানের বিস্তারিত নিয়ম — কুরআন ও হাদিসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ বাংলা নির্দেশিকা।

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম হলো যাকাত। রমজান মাস এলে মুসলিমরা তাদের সম্পদের হিসাব করে যাকাত আদায় করতে বেশি তৎপর হন। সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম।

গুগল সার্চে অনেকেই যাকাত নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করেন। আপনাদের সুবিধার্থে যাকাত সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসার বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য উত্তর নিয়ে আজকের এই পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকাটি তৈরি করা হলো।

১. জাকাত শব্দের অর্থ কি এবং যাকাত কাকে বলে?

জাকাত শব্দের অর্থ কি?

আরবি 'যাকাত' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা, বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা এবং বরকত।

যাকাত কাকে বলে?

ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়, কোনো মুসলিমের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে, সেই সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ২.৫%) মহান আল্লাহর নির্ধারিত অভাবী মানুষদের মাঝে ব্যয় করাকে যাকাত বলে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে অবশিষ্ট সম্পদ পবিত্র হয়।

২. যাকাত কত প্রকার ও কি কি?

অনেকেই জানতে চান, যাকাত কত প্রকার ও কি কি? মূলত যাকাতকে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • ১. যাকাতুল মাল: এটি হলো মানুষের জমানো সম্পদ, ব্যবসা, নগদ অর্থ বা স্বর্ণ-রৌপ্যের ওপর প্রযোজ্য যাকাত।
  • ২. যাকাতুল ফিতর (ফিতরা): এটি হলো রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের আগে রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের উদ্দেশ্যে আদায় করা যাকাত, যা পরিবার প্রধান তার অধীনস্থদের পক্ষ থেকে আদায় করেন।

৩. যাকাত কাদের উপর ফরজ এবং কোন কোন সম্পদে ফরজ?

যাকাত কাদের উপর ফরজ?

স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং ঋণমুক্ত এমন কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন এবং সেই সম্পদ তার কাছে পূর্ণ এক চন্দ্রবছর জমা থাকে, তবে তার ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ।

কোন কোন সম্পদের উপর যাকাত ফরজ?

প্রধানত চারটি সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়:

  • ১. স্বর্ণ ও রৌপ্য
  • ২. নগদ অর্থ বা ব্যাংক ব্যালেন্স
  • ৩. ব্যবসার পণ্য
  • ৪. নির্দিষ্ট পরিমাণ গবাদিপশু ও কৃষিজাত ফসল (যাকে 'ওশর' বলা হয়)

মানুষের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, থাকার বাড়ি বা যাতায়াতের গাড়ির ওপর যাকাত ফরজ হয় না।

৪. যাকাত নিসাব এবং টাকার হিসাব

যাকাত নিসাব

'নিসাব' বলতে বোঝায় সম্পদের সেই ন্যূনতম পরিমাণ, যা থাকলে যাকাত ফরজ হয়। শরীয়ত অনুযায়ী:

  • স্বর্ণের নিসাব: সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি বা তোলা
  • রুপার নিসাব: সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি

বর্তমানে কত টাকা হলে যাকাত ফরজ?

বর্তমান নিয়মে, কারো কাছে যদি সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার বর্তমান বাজারমূল্যের সমপরিমাণ নগদ টাকা, ব্যাংকে জমানো অর্থ বা ব্যবসার সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকে, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে। রুপার দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে, তাই যাকাত আদায়ের সময় বাজার যাচাই করে নেওয়া উচিত।

১ ভরি স্বর্ণের যাকাত কত টাকা?

এটি একটি সাধারণ প্রশ্ন। নিয়ম হলো, যদি কারো কাছে শুধুমাত্র ১ ভরি স্বর্ণ থাকে এবং অন্য কোনো নগদ অর্থ বা সম্পদ না থাকে, তবে তার নিসাব পূর্ণ হয়নি বলে যাকাত দিতে হবে না। কিন্তু যদি তার কাছে নিসাব পরিমাণ অন্যান্য সম্পদ (যেমন নগদ টাকা বা রুপা) থাকে, তবে ওই ১ ভরি স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্যের ২.৫% যাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে।

যাকাত ক্যালকুলেটর

আপনার মোট জমা সম্পদ থেকে আপনার বর্তমান ঋণ বাদ দিয়ে নিসাব হয়েছে কি না, তা বের করা অনেক সময় জটিল মনে হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনি অনলাইনে থাকা নির্ভরযোগ্য কোনো 'যাকাত ক্যালকুলেটর' ব্যবহার করে খুব সহজেই আপনার প্রদেয় যাকাতের পরিমাণ বের করে নিতে পারেন।

৫. যাকাত প্রদানের নিয়ম এবং বন্টনের খাতগুলো

যাকাত প্রদানের নিয়ম

যাকাত প্রদানের নিয়ম এবং যাকাত বন্টনের নিয়ম অত্যন্ত সুস্পষ্ট। যাকাত দেওয়ার সময় অবশ্যই মনে মনে যাকাতের নিয়ত করতে হবে (মুখে বলা জরুরি নয়)। তাছাড়া যাকে যাকাত দেওয়া হচ্ছে, ওই সম্পদের ওপর তাকে পূর্ণ মালিকানা (তামলিক) দিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ, যাকাতের টাকায় কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান বা রাস্তাঘাট নির্মাণ করে দিলে যাকাত আদায় হবে না।

যাকাত বন্টনের খাতগুলো পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এর বাইরে কাউকে যাকাত দিলে তা আদায় হবে না।

যাকাতের ৮টি খাত কী কী?

কুরআন অনুযায়ী যাকাত বন্টনের ৮টি খাত হলো:

  • ১. ফকির: যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই বা যে অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত।
  • ২. মিসকিন: যে ব্যক্তি নিজের অভাব মেটাতে পারে না এবং সম্মানের ভয়ে অন্যের কাছে হাতও পাতে না।
  • ৩. আমিল: ইসলামি রাষ্ট্র কর্তৃক যাকাত আদায় ও সংরক্ষণের কাজে নিযুক্ত কর্মচারী।
  • ৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব: ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য বা নবমুসলিমদের সাহায্যার্থে।
  • ৫. দাস মুক্তি: দাস বা বন্দীদের মুক্ত করার কাজে (বর্তমানে এই খাতটি নেই বললেই চলে)।
  • ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (গারিমিন): যার কাছে ঋণ শোধ করার পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে না।
  • ৭. ফি সাবিলিল্লাহ: আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামকারী বা দ্বীনি কাজে নিয়োজিত অভাবী ব্যক্তি।
  • ৮. ইবনুস সাবিল (মুসাফির): যে ব্যক্তি বিদেশে বা সফরে গিয়ে সম্পদহীন ও অসহায় হয়ে পড়েছে (যদিও নিজ দেশে সে ধনী হয়)।

উপসংহার

যাকাত শুধু গরিবের প্রতি ধনীর করুণা নয়, বরং এটি গরিবের হক বা অধিকার। সঠিক নিয়মে যাকাত আদায় করলে সমাজ থেকে যেমন দারিদ্র্য দূর হয়, তেমনি নিজের সম্পদও আল্লাহর রহমতে বৃদ্ধি পায়।